পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট রাতে কী ছিল খুনিদের গতিপথ? ওই রাতে ঢাকা সেনানিবাস থেকে ৩টি গ্রুপে ভাগ হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে ছড়িয়ে পড়েছিল কুচক্রী সেনাদল। মিশন, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাইকে হত্যা করা। ধানমণ্ডি আর মিন্টো রোডে এ হত্যাযজ্ঞ ঘটানোর পাশাপাশি শাহবাগে খুনিরা দখলে নেয় বেতারকেন্দ্র। বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কুক্ষিগত করে ক্ষমতা। কোন পথ ধরে এগিয়েছিল তারা?
১৪ আগস্ট দিবাগত রাত ২টা, নিস্তব্ধ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। বুটের খটাখট শব্দ ও সামরিক যানের আনাগোনায় সেই নির্জনতা ভেঙে পড়ে। বালুঘাটে আর্টিলারির ট্রেনিং ফিল্ডে আসেন কয়েকজন মেজর। নৈশকালীন প্রশিক্ষণের অজুহাতে সেখানে জড়ো করা সৈন্যদের জানালেন পুরো পরিকল্পনা। ভোর পৌনে ৫টার দিকে তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে ট্যাংক ও কামান বহর নিয়ে রওনা দেয় কিলিং মিশন, উদ্দেশ্য ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর। এর বাইরে ধানমণ্ডিরই আরেকটি ও মিন্টো রোডের আরো একটি বাড়ি। একই সঙ্গে টার্গেট বঙ্গভবন, বেতার ও টিভিকেন্দ্র।
বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, তাদের স্ত্রী সুলতানা ও রোজী, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, শিশু রাসেলকেও ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হত্যা করা হয় হয়। গুলির শব্দে দোতলার ঘর থেকে বের হয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু।
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে খুনিদের লক্ষ্য করে হুঙ্কার ছাড়ে বলেন, আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস তোরা, সঙ্গে সঙ্গেই ঘাতকের ব্রাশফায়ার। লুটিয়ে পড়লেন জাতির জনক, থমকে দাঁড়ালো বাংলাদেশ।
একই সময়ে খুনিচক্রের আরেকটি গ্রুপ অপারেশন চালায় ধানমণ্ডি লেকের অপর পাড়ে বঙ্গবন্ধুর বোনের ছেলে যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ মনিরের বাসায়। সেখানে নিহত হন শেখ মনি তার অন্তসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান দুই ছেলে পরশ ও তাপস।
এদিকে, ৩২ নম্বরকে টার্গেট করে খুনিদের ছোড়া কামানের গোলা গিয়ে পড়ে মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সুরী রোডে। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় আরো ১৩জন। যে শিশু মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছিলো বাঁচতে পারেনি সেও।
সেই কালরাতে মৃত্যুপরোয়ানা জারি হয়েছিল মিন্টো রোডে মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের সরকারি বাড়িতেও। ভোররাতে সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল খুনিরা। সেরনিয়াবাতের সংগে খুন হন তার মেয়ে বেবী, ছেলে আরিফ, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর ৪ বছরের ছেলে বাবুও।
পরে কিলিং মিশন শেষে সকালে খুনিদের দল বেতার ভবনের দখল নেয়।
হত্যাকাণ্ড শেষ, রেডিওতে ঘোষণাও হয়ে গেছে— এখন যেন খুনিদের বিশ্রাম নেয়ার পালা। তাই স্থান হিসেবে বঙ্গভবনকে বেঁছে নেয়া হল। যেখানে আগে থেকেই জেঁকে বসেছিল খুনিচক্র। ততোক্ষণে রাষ্ট্রপতির মসনদে আসীন কুচক্রীশিরোমণি খন্দকার মোশতাক।