বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড শুধু কিছু সেনাসদস্য বা রাজনীতিকের ঘৃণ্য চক্রান্তের বাস্তবায়ন নয় এরসঙ্গে ছিল সুগভীর আন্তর্জাতিক সংযোগ। একাত্তরে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন করে আর পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ তখন থেকেই একটি অক্ষশক্তির টার্গেট। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দলিলে এসব স্পর্শকাতর বিষয়ের প্রমাণ সূত্র পাওয়া গেছে। দলিল বলছে তৎকালীন সেনা উপপ্রধান জিয়ার নির্দেশনায় অস্ত্র সংগ্রহে ফারুক-রশীদ গং তিন দফায় যান মার্কিন দূতাবাসে। দেশ টিভিকে দেয়া বিশিষ্টজনের একান্ত সাক্ষাতকারে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তির মদদপুষ্ট রাজনৈতিক চক্রের ইন্ধনে ফারুক-রশীদের নেতৃত্বাধীন একটি কুচক্রী সেনাদল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও বাংলাদেশকে স্তব্ধ করার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র সচল ছিল অনেক আগে থেকেই। যেদিন বাংলাদেশ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে শত্রুরা সচকিত ছিল তখনই।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যাতে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে না পারে এবং বঙ্গবন্ধু যেন ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমে সফল না হন সেজন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে দেশীয়-আন্তর্জাতিক চক্র।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক আশফাকুর রহমান বলেন, ‘আমেরিকার ভূমিকা আমাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে, আমেরিকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের রোল উই নট ফ্রেন্ডলি।’
নিরাপত্তা ও সামরিক বিশ্লেষক মে. জে. আব্দুর রশীদ বলেন, ‘বিশ্বের সাধারণ জনগণের অধিকার সম্পন্ন যেসব সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলোর বিরুদ্ধে কিন্তু তৎকালীন মার্কিন সাম্রজ্যবাদের সিআইএ এদের যে পরিকল্পনা এবং এদের যে অ্যাকশন আমরা অনেক দেশেই দেখেছি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল এটি নিসন্দেহে বলা যায়।’
অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকে অজনপ্রিয় করতেও চক্রান্তের জাল ছড়ানো হয়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, খাদ্য সংকট তৈরির পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা চলে নিরাপত্তা বাহিনীতে।
সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘মোস্তাক হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী, তুলা কেনার জন্য মিসরে গেলেন, চলে আসলেন ৩০টা ট্রাঙ্ক নিয়ে। এসে বঙ্গবন্ধুকে বললেন আনোয়ার সাদাত তোমাকে ৩০টা ট্রাঙ্ক উপহার দিয়েছেন। কিন্তু একজন জুনিয়র অফিসার হয়েও আমি কিন্তু চিন্তিত ছিলাম। এ ট্রাঙ্ক কিন্তু তুলার বদলে ট্রাঙ্ক নয় এটা রক্ত পিপাসু দানব পাঠানো হয়েছে।’
সেই পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয় দুই জুনিয়র সেনা কর্মকতা ফারুক-রশীদ। তিন দফায় তারা ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত গোপন দলিলে দেখা যায় দূতাবাস কর্মকর্তা নিউবেরি ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় জানান, জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ফারুক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র সহায়তা চেয়েছেন।
লেখক-সাংবাদিক ও গবেষক মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘ফারুক গিয়েছেন ৭২তে মানে হচ্ছে কি? তারা ৭২/৭৩ গিয়েছেন, ৭৩ তে অস্ত্র কেনার কথা বলেছেন, জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত আর্ম পার্সেস কমিটির পক্ষে থেকে আমরা এসেছি। কিন্তু সেই কমিটির প্রধান ছিলেন জেনারেল সফিউল্লাহ সেনা প্রধান হিসেবে। জেনারেল জিয়া নন।’
কিন্তু রহস্য হচ্ছে এ তথ্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার বা তাদের দূতাবাস বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করেনি। তথ্য গোপনের এমন অনেক নজির-ই চক্রান্তের সঙ্গে নানাবিধ আন্তর্জাতিক যোগসাজসকে সামনে নিয়ে আসে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এটুকু বলতে পারি ষড়যন্ত্র ছিল। ফারুক-রশীদ যারা হত্যা করেছিল, তাদের পেছনে অনেক ষড়যন্ত্র ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ জানত, ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু স্পষ্ট করে আমাদের বলেনি।’