বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে মার্কিন সংশ্লিষ্টতার দালিলিক প্রমাণ এখনো নেই, তবে সে সময় ঢাকায় তাদের রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টারের তারবার্তাগুলোর তাৎপর্য গুরুত্ববহ। তাতে দেখা যায়, মুজিব সরকারকে উৎখাতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। অথচ কুচক্রী সেনা অফিসারদের এমন রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার কথা বাংলাদেশকে জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
এ রহস্য থেকেই কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দালিলিক প্রমাণ না থাকলেও খুনিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রশ্নাতিত নয়।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে খুন করে ফারুক-রশীদের নেতৃত্বাধীন একটি সেনাদল। এ ঘাতক সেনারা মদদ পেয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক চক্রের। ইন্ধন ছিল বিদেশি শক্তিরও। যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্ত দলিলের পরতে পরতে এমনই তথ্য দেখা যায়।
দলিলে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের ১৩ মে ফারুক ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে মুজিব সরকারকে উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তা চায়। এ গোপন বৈঠকের খবর জানিয়ে ওয়াশিংটনে তারবার্তা পাঠান সে সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার। দেশ টিভিকে দেয়া বিশিষ্টজনের একান্ত সাক্ষাতকারে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সাংবাদিক, লেখক-গবেষক মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘তারা এখানে (বাংলাদেশ) ঊর্ধতন সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে এসেছিলেন। সেই ঊর্ধ্বতন সামরিক বাহিনী কে ছিলেন? সেটা জানা যায়নি। তবে দেখা যায়, ১৯৭৪ হেনরি কিসিঞ্জারের আসার আগে ফারুক সরাসরি তাদের যে পাবলিক রিলেশন অফিসার ছিলেন তার বাসাতে গিয়ে বাংলাদেশে তারা অভ্যত্থান ঘটাতে চান। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারে সহযোগিতা চান, সেটা তারা বলেছেন।’
খুনিদের যাতায়াত দূতাবাস পর্যন্ত গড়ালেও তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সিনিয়র কুটনীতিকরা মনে করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুক্ত থাকার দালিলিক প্রমাণ এখনও নেই। তবে সেই রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা জেনেও বাংলাদেশ সরকারের কাছে চেপে যাওয়া রহস্যজনক।
কূটনীতিক বিশ্লেষক ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফারুক-রশীদের সম্পর্ক ছিল। তাই আমি মনে করি, তাদের ধারনা ছিল বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং তাকে হত্যা করা হতে পারে।’
আর বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিতে সে সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের দূতিয়ালি আরেক রহস্য। মিসর, কাতার, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন মিশন প্রধানদের কাছে এ ব্যাপারে তারবার্তা পাঠান তিনি।
সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউদ্দিন (অব.) বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থানটা মেনে না নেয়ার যে দলটিতে হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন তাদের মহাগুরু। তবে মাহগুরু থাকলেও তাদের কাজ ধুমধারাক্কা হয়নি। খুবই শান্তভাবে তারা তাদের কাজ চালিয়ে গেছেন।’
কূটনীতিক বিশ্লেষক আশফাকুর রহমান বলেন, ‘কিসিঞ্জারের ভুমিকা বাংলাদেশের জন্য সঠিক ছিল না। সে (কিসিঞ্জার) তখন সেটা করেছে পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে এবং একটি সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন চীনের সঙ্গেও। তাই সে এটা করতেই অনেক ব্যস্ত ছিলেন তিনি।’
মিজানুর রহমান খান বলেন, তার (কিসিঞ্জার) টেলিফোন বার্তা যেগুলেো তিনি করেছিলেন, সেগুলোর কিছু কিছু বিষয় সামনে এসেছে। তা থেকে দেখায় যে, ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশে যে অভ্যুর্থান ঘটায় ব্যক্তিগতভাবে কিসিঞ্জার সেটাকে ব্যক্তিগত পরাজয় হিসেবে দেখে ছিলেন। তাই সেটার একটি ছাপ তারা এইড পলিসির মধ্য দিয়ে এর বাস্তবায় করে যাছিলেন বা তার একটি প্রতিফলন ঘটিয়ে যাচ্ছিলেন। যেটা কিন্তু বঙ্গবন্ধু সরকারের দুর্বল হয়ে যাওয়া বা তার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাওয়া। এটাই তাদের ভুমিকা ছিল।’
এছাড়াও তৎকালীন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ সিসকোও এক্ষেত্রে কিসিঞ্জারের যথার্থ সহযোগী। ইসলামাবাদকে এক তারবার্তায় তিনি বলেন, পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের জানা উচিত, ১৫ আগস্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কতোটা অব্যাহতভাবে পরস্পর মতবিনিময় করতে চায়।