শোকাবহ ১৫ আগস্টকে ঘিরে ‘ষড়যন্ত্র-জাল’ ধারাবাহিকে থাকছে পাকিস্তান-আইএসআই প্রসঙ্গ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তান বা আইএসআই সংশ্লিষ্টতার সোজা-সাপটা প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় না। কিন্তু খুনি ফারুক-রশীদকে লিবিয়ায় আশ্রয় দেয়ায় বিশেষ ভুমিকা রেখেছিল ইসলামাবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের দলিল বলছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জারের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর বৈঠকে - ভুট্টো, মুজিব সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিসিঞ্জারকে জানান, সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসবে এবং তারা হবে ভারত বিরোধী। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মুশতাক আহমদের সরকারকে দেয়া সমর্থন পত্রে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ' উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছিল ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ১৬ ডিসেম্বর। পরাজিত পাকিস্তান বাহিনী সেদিনই আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সেটাই গৌরব-যাত্রা।
কিন্তু পরাজিত শক্তি বাংলাদেশের জয়যাত্রাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি । মুজিব সরকারকে অজনপ্রিয় করে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র শুরু করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা- আইএসআই। সঙ্গী হয় এদেশীয় একদল কুচক্রী রাজনীতিক ও কতিপয় সেনা অফিসার।
সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউদ্দিন বলেন , ‘মুজিবকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া, পাকিস্তান আইএসআই মোর দেন ২০০০ এজেন্স ইন বাংলাদেশ। পাকিস্তানপন্থী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলগুলো মনে বাংলাদেশে র বাজারে এ কথাগুলো চলবে, ওদের ২০০০ হাজার লোক হোটেল, বাসস্ট্যান্ড লঞ্চঘাট, ট্রেন স্টেশন এ জায়গাগুলোতে বসে আড্ডা মেরে চা খাওয়ার মধ্য দিয়ে একই গল্প আধা ঘণ্টার মধ্য সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে দিবে এবং আমাদের মানুষ হচ্ছে প্রপাগণ্ডার কাছে দুর্বল।’
ফারুক-রশীদের নেতৃত্বে তারা সেনাবাহিনীতে ভারত ও রক্ষীবাহিনী বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালায়। সেই তথ্য গোয়েন্দারা বঙ্গবন্ধুকে অবহিতও করেছিলেন।
মেজর মেজর জিয়াউদ্দন বলেন, ‘যখন একজন লোক ধরা পড়ল ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে তার কাছে ফারুক-রশীদের ও পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সমস্ত তথ্য আদিপ্রান্ত ঘটনা জানা গেলে। এটা ধরা পড়েছিল ১৯৭৪ সালে মার্চ বা এপ্রিল বা মে। বিভাগটা আমার ছিল না। কাজটা করেছিল ডিজিএফআইয়ের সিএমই বেঞ্চ। এটা প্রত্যেক গোয়েন্দা সংস্থা থাকে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্ত করা দলিলেও আছে সেই তৎপরতার তথ্য। দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৬ মাস আগে ৭৫-এর ৫ ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর বৈঠক হয়।
ভুট্টো কিসিঞ্জারকে জানান, মুজিব সরকার বেশিদিন টিকবে না, সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসবে।
সাংবাদিক-গবেষক মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘ওই বৈঠকটা হয়েছিল ব্লেয়ার হাউসে যেটা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল গেস্ট হাউস, পেসসিলভেনিয়ার এভিনিউতে। এটা খুবই মজার ব্যাপার নির্দিষ্টভাবে বলা যে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসবে। এই কথাটা ফেব্রুয়ারিতে বলা এবং তারপরও কিন্তু আমরা দেখি যে, আমেরিকান এমব্রসি মার্চে তারা একেবারে নিশ্চিত ছিল একটা অভ্যত্থান এখানে ঘটতে যাচ্ছে। মুজিব সরকার ঠিকবে না এবং সেনাবাহিনী আসবে এ দুটো বিষয় কিসিঞ্জারকে ভূট্টো খুবই স্পষ্ট করে বলেছিলেন।’
আর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় ইসলামবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি এ. বাইরোড জানান, ভুট্টো তাকে বলেছেন,বাংলাদেশ এখন থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র । মুশতাক সরকারকে তারা সর্বাত্মক সহায়তা করবেন।
মিজানুর রহমান খান, ‘ভূট্টো ফোন করেছিলেন বাইরুটকে, ফোন করে তিনি তার কথা বলেছেন যে, ভূট্টোর এই আকাঙ্খা ইসলামী রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ তার কি প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ সম্পর্কে সেটা তিনি প্রকাশ করেছিলেন।’
আর ১৮ আগস্ট মুশতাককে পাঠানো বার্তায়ও ভুট্টো বাংলাদেশকে উল্লেখ করেন ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে। জানান, ভারত আক্রমণ করলে সৌদি আরবকে তা প্রতিহত করার জন্যও তিনি অনুরোধ করবেন।