মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে শেরপুরের জামাত-আলবদর নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। সোমবার আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন ৪ বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় দিয়েছে।
বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন: বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
গত বছরের ৯ মে ময়মনসিংহের আল-বদর প্রধান কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে হত্যা ও গণহত্যার দুটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অন্য দুটি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরেকটিতে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
গত বছরের ৬ জুন ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন কামারুজ্জামান। আর ট্রাইব্যুনালে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় আপিল করেনি।
সুপ্রিম কোর্টে আপিল দাখিলের পর চলতি বছর ৫ জুন শুনানি শুরু হয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। এরপর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে আপিল বিভাগ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে করা তৃতীয় আপিলের রায় এটি।
এর আগে আপিল বিভাগে কাদের মোল্লা ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, রাজাকার শিরোমনি গোলাম আযমের আপিল শুনানি শেষের পর রায় আসে । এরমধ্যে কাদের মোল্লাকে আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড দেয়। সাঈদী পেয়েছে আমৃত কারাদণ্ড ও রাজাকার শিরোমনি পান আমৃত কারাদণ্ড। তবে গোলাম আযম কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান। আর বিএনপি নেতা আবদুল আলীম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান।
গত বছরের কাদের মোল্লার রায় ডিসেম্বরে কার্যকর হয়। আর সাঈদীর আপিলের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ।
প্রমাণিত অভিযোগ:
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর ‘বিধবাপল্লীতে’ নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড এবং গোলাম মোস্তফা হত্যাকাণ্ডের দায়ে (তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগ) তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।
বদিউজ্জামান ও দারাসহ ছয় জনকে হত্যার (প্রথম ও সপ্তম অভিযোগ) দায়ে যাবজ্জীবন এবং একাত্তরে শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানের প্রতি অমানবিক আচরণের দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
সোমবার আপিল বিভাগের রায়ে ৩ নম্বর অভিযোগে শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুরে ১২০ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে হত্যার দায়ে সর্বসম্মতভাবে কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আর তাকে মৃত্যদণ্ড দেয়া হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে।
তবে চতুর্থ অভিযোগে গোলাম মোস্তফাকে হত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আপিল বিভাগ।
গ্রেপ্তার:
রাজধানীর পল্লবী থানায় করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ১৩ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ২ অক্টোবর তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
অভিযোগ গঠন:
২০১২ সালের ৪ জুন ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ গঠন করেন। ২ জুলাই এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার:
গত বুধবার জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও গতকাল রোববার দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর মামলার রায়সহ দুটি ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ১১টি মামলার রায় দিয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭টিতে দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে। তবে পলাতক আবুল কালাম আজাদ এবং চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান আপিল করেননি। কামারুজ্জামানসহ চূড়ান্ত রায় হয়েছে ৩টির। এর মধ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আপিল বিভাগ। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং এ দণ্ড ১২ ডিসেম্বর রাতে কার্যকর হয়। কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো।
দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার পর জামাতের সাবেক আমির ও রাজাকার শিরোমনি গোলাম আযম এবং বিএনপির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম মারা গেছেন। তাদের মৃত্যুতে আপিল অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে।
জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।