মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আল বদর নেতা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মঙ্গলবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে জল্লাদ রাজুর নেতৃত্বে ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
কারাসূত্র জানা গেছে, মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি দেয়ার আগে তাকে গোসল করানো হয় এবং জমটুপি পরিয়ে ফাঁসিমঞ্চে তোলা হয়। এ সময় উপস্থিত থাকেন জেলা প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দিন, সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা, জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরে নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করে জল্লাদ রাজু ও সহযোগীরা।
এর আগে ফাঁসির মঞ্চ এলাকায় লাগানো হয় ফ্লাড লাইট। মঞ্চে টানানো হয়েছে নতুন শামিয়ানা। আনা হয় ম্যানিলা রশি। সেইসঙ্গে প্রস্তুত রাখা হয় ৮ জল্লাদ।
রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ ইকবাল হাসান, ১০টা ১২ মিনিটে ঢাকা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন ও ১০টা ২১ মিনিটে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন।
এর আগে রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবদুল মালেক মৃধা এবং এশার নামাজের পর কারাগারে প্রবেশ করেন ওই মসজিদের ইমাম মনির হোসেন।
নিজামীর সঙ্গে কারাগারে প্রায় পৌনে ২ ঘণ্টা ধরে সাক্ষাৎ করেছেন তার পরিবারের স্বজনেরা।
এদিকে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফাঁসির প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করেছেন কারা কর্মকর্তারা। বৈঠকে ছিলেন অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. ইকবাল, কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেলসুপার জাহাঙ্গীর কবির, জেলার নেসার আলমসহ বেশ কয়েকজন কারা কর্মকর্তা।
এর আগে কারাগারের ভেতরে ঢুকে পরিদর্শন করেন তারা।
তবে এ যুদ্ধাপরাধী প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কিনা সে বিষয়টি এখনো ঝুলিয়ে রেখেছেন— ফাঁসির আদেশ কার্যকরের জন্য সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। কেন্দ্রীয় কারাগারে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তি হলেই রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
আলবদর প্রধান নিজামির ফাঁসি কার্যকরের সকল প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছে কারাকর্তৃপক্ষ—এরইমধ্যে কারাগার পরিদর্শন করেছেন ঊর্ধ্বতন কারাকর্মকর্তারা। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে কারাগারের আশেপাশে।
ফাঁসির অপেক্ষায় থাকা এ যুদ্ধাপরাধীকে রাখা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেমড সেলে। নিজামী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবে কিনা সে বিষয়টি জানতে জেলা প্রশাসনের পক্ষে ম্যাজিস্ট্রেটরা কারাগারে যাবেন। প্রাণভিক্ষা না চাইলে বা চাওয়ার পর আবেদন নাকচ হলে শুরু হবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া।
ইতিমধ্যে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। এ যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে শেষবারের মতো তার স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাত করতে দেয়া হবে। এরপর তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে কনডেমড সেলে তওবা পড়াবেন কারা মসজিদের ইমাম। এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, পুলিশের প্রতিনিধিসহ ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ফাঁসি কার্যকর করা হবে এ মানবতাবিরোধী অপরাধীর।
এর আগে সোমবার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির (কনডেমড) সেলে থাকা নিজামীকে রিভিউয়ের খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে শোনানো হয়ে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা গেছে, পূর্ণাঙ্গ রায় পৌঁছানোর পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তা নিজামীকে পড়ে শোনানো হয় এরপর চিকিৎসকেরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন।
এর আগে গতকাল নিজামীর রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে প্রকাশিত হয়। ২২ পৃষ্ঠার এ রায় লিখেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, এতে বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি একমত হয়ে সই করেছেন।
বিকেল ৫টার দিকে এ রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে পৌঁছায়। ট্রাইব্যুনাল থেকে পূর্ণাঙ্গ রায় সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছায়।
রোববার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয় নিজামীকে।
এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া চারজনের দণ্ড এই কারাগারে কার্যকর হয়েছে।
তারা হলেন: জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী।