রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাঁওতাল বিমল কিসকো ও চরণ সরেনকে মঙ্গলবার ছাড়পত্রের পর পুলিশ তাদের গাইবান্ধা কারাগারে নিয়ে গেছে। এদিকে, প্রশাসনের উচ্ছেদ কার্যক্রম কোন কর্তৃত্ববলে পরিচালনা করা হয়েছে তা জানতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও শিল্পসচিবসহ ৯ জনের বরাবর আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আ.স.ম বরকতুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসাধীন দুই সাঁওতালের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাদের হাসপাতাল ত্যাগের ছাত্রপত্র দেয়া হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার বলেন, বিমল কিসকো ও চরণ সরেনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের দুজনকে পুলিশ পাহারায় রংপুর থেকে গাইবান্ধা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের ছাড়পত্র পাওয়ার পর বিমল কিসকো সাংবাদিকদের জানান, পুলিশের গুলি তার দুই পায়ে বিদ্ধ হয়েছে। এরপর তাকে চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তার চিকিৎসা চলছিল হাতকড়া পড়া অবস্থায়। পরে হাতকড়া খুলে দেয়া হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, 'সুস্থ না হতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়পত্র দিয়েছে।'
বিমল কিসকোর স্ত্রী চিচিলিয়া বাসকেন বলেন, 'আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। বাড়ি ঘর সব পুড়িয়ে দিয়েছে। এখন স্বামীকে জেলে নিয়ে যাচ্ছে। আমার স্বামী তো কোনো দোষ করেনি।'
এদিকে, গত ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে প্রশাসনের উচ্ছেদ কার্যক্রম কোন কর্তৃত্ববলে পরিচালনা করা হয়েছে তা জানতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও শিল্পসচিবসহ ৯ জনের বরাবর আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালদের দিন কাটছে খোলা আকাশের নিচে। আতঙ্ক আর গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। খেয়ে না খেয়ে কোনমতে বেঁচে আছেন তারা। ফিরিয়ে দিয়েছেন সরকারের পাঠানো ত্রাণও।
স্থানীয় সাংসদ এবং সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যানের আশ্বাসে সাহেবগঞ্জ আখ খামারে বসতি গড়েছিলেন তারা। আদিবাসী সাঁওতাল, হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের ভূমিহীন মানুষ শুরু করেন ঘরবসতি। কিন্তু, হঠাৎ করেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সবুজের ক্ষেত তছনছ হয়ে যায়।
দিনভর বঞ্চনার আগুনে পুড়ছেন এখানকার নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ সাঁওতালগোষ্ঠী। সামনে কী হবে তারা জানেন না। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তা আর দীর্ঘশ্বাস এখন তাদের একমাত্র সঙ্গী। কখনও কখনও জড়ো হচ্ছেন স্থানীয় গীর্জা চত্বরে। কোনো কাজ করতে না পারায় দিন কাটছে প্রায় না খেয়ে।
মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন অসহায় মানুষগুলো।
এদিকে, সাঁওতালদের স্বাভাবিক চলাফেরায় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদ।
গোবিন্দগঞ্জে হামলার ঘটনায় আহত দ্বিজেন টুডুর স্ত্রী অলিভিয়া হেমব্রম ও ক্ষতিগ্রস্ত গণেশ মুর্মুর স্ত্রী রুমালিয়া কিছকুর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যাতির্ময় বড়ুয়া এই আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।
নোটিশ গ্রহণ করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিতভাবে ওই বিষয়ে জানাতে বলা হয়েছে। নোটিসে আরো জানতে চাওয়া হয়েছে, বাড়িঘরে আগুন, লুটপাট ও গ্রামবাসীসহ নিরীহ লোকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
এদিকে, গাইবান্ধায় আদিবাসী-বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক শীর্ষক আলোচনা সভা ও মানববন্ধন হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ও কাটাবাড়ি ইনিয়ন পরিষদের আয়োজনে কাটাবাড়ি মোড়ে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
রোববার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের জমির দখলকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে পুলিশসহ ৩০ জন আহত হয়। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ সাঁওতাল শ্যামল হেমব্রম হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। পরদিন চিনিকলসংলগ্ন সাহেবগঞ্জ এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে আরেক সাঁওতালের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। হামলার পরদিনও সাঁওতালদের ঘরবাড়িতে চলে লুটপাট।