মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে আলবদর বাহিনীর প্রধান জামাত নেতা মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বুধবার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। নিজামীর উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি হলেন: জাহাঙ্গীর হোসাইন ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক।
ট্রাইব্যুনাল জানায়, যদি ফাঁসি না দেয়া হয়, তাহলে তা হবে বিচারের ব্যর্থতা।
রায়ের আগে চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, আমরা আমাদের বিবেক, আইন ও সংবিধান দ্বারা পরিচালিত, আমাদের ওপর কোনো নির্দেশ নেই। আমরা আপস এবং সমঝোতা করি না। তা করলে আইন ও সংবিধানের জন্যই করি।
বিচারপতি আরো বলেন, সবাই এ মামলার রায়ের অপেক্ষায় ছিল। আমরাও অপেক্ষা করেছি এ ভারডিক্ট কবে দিতে পারব। এ অপেক্ষার কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহল ও গণমাধ্যমে নানা কথা উঠে এসেছে। এসব কথা আমাদের আমলে নেয়ার সুযোগ নেই। আমরা এর জবাব দিতে পারি না, জবাব দেয়া উচিৎও হবে না।
বিচারক বলেন, আমরা আদালত বলতে গেলে বোবার মতো থাকি। যারা মন্তব্য করেন, তাদের মনে রাখা উচিৎ, আমরা কোনো জবাব দিতে পারি না।
১৬টি মধ্যে ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এতে ৮টিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এছাড়া ২টি অভিযোগে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি সুস্পস্ট। রুমি হত্যাসহ ৪টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
২, ৪, ৬, ১৬ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং ১, ৩, ৭, ৮ নম্বর অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ প্রমাণিত বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছে।
প্রমাণিত অভিযোগ:
প্রমাণিত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক কছিম উদ্দিন (কছিম মাওলানা) কে অপহরণ ও হত্যা; পাবনার সাঁথিয়ায় হত্যা, ধর্ষণ ও দেশত্যাগে বাধ্য করা; ঢাকায় ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের ক্যাম্পে সংঘটিত অপরাধ-ষড়যন্ত্র; পাবনার করমজা গ্রামে হত্যা, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ,ও সম্পত্তি ধ্বংস; পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে হত্যা, বৃশালিখা গ্রামে নির্যাতন ও হত্যার অপরাধ; ঢাকার লাখাল পাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেল ক্যাম্পে সংগঠিত হত্যায় সম্পৃক্ততা এবং গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে মতিউর রহমান নিজামীর সম্পৃক্ততা।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দিন ঠিক করে।
একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিস্টতাসহ ১৬টি অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ৩ দফায় তার বিচারটি অপেক্ষমাণ রাখা হয়। অবশেষে আজ বুধবার এ রায় দিল ট্রাইব্যুনাল।
নিজামীর রায়টি হবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দশম রায়। এর আগে ৯টি মামলায় জামাতের ৮ জন ও বিএনপির ২ নেতাকে দণ্ডাদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোকলেছুর রহমান বলেন, নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার সর্বোচ্চ সাজাই হয়েছে।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে গত বছরের ২৮ মে ১৬টি অভিযোগে বিচার শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। শুনানির একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান অবসরে যাওয়ায় আটকে যায় মামলার কার্যক্রম। ট্রাইব্যুনালে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর গত ১০ মার্চ নতুন করে শুরু হয় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, উস্কানি, হত্যা পরিকল্পনা ও বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিজামীকে ২০১০ সালের ২ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গত বছরের ২৮ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তার বিরুদ্ধে ১৬টি সুনির্দিষ্ট অপরাধে অভিযোগ গঠন করে।
অভিযোগগুলো হচ্ছে:
পাবনায় বৃশালিকা গ্রাম ঘেরাও করে ৭০ জনকে গুলি করে হত্যা ও ৭২টি বাড়িতে আগুন দেয়া। ডেমরা ও বাউশগাড়ী গ্রামে ৪৫০ জন নারী পুরুষকে গুলি করে হত্যা। ৩০ থেকে ৪০ জন নারীকে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দেয়া। ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যায় সংশ্লিষ্টতা।
৭১ বছর বয়সী নিজামী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করা চতুর্থ রাজনীতিবিদ, আদালত যাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিল। এর আগে চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে।
বিগত চার দলীয় জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রীও ছিল মতিউর রহমান নিজামী। তার আগে ২০০১-০৩ সময়ে ছিলেন কৃষিমন্ত্রী।
এর আগে গত ২৪ জুন নিজামীর যুদ্ধাপরাধের রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হলেও ওই দিন সকালে তিনি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে হাজির করেননি কারা কর্তৃপক্ষ। ফলে ওই দিন রায় ঘোষণা করেনি ট্রাইব্যুনাল।