মানবতাবিরোধী অপরাধে আলবদর কমান্ডার ও জামাত নেতা মীর কাসেম আলীকে ফাঁসির রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত দুই সদস্যে বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে।
তার বিরুদ্ধে আনা ১৪টি অভিযোগের ৩৫১ পৃষ্টার রায় সংক্ষিপ্ত আকারে পড়া হয়।
রায়ে বলা হয়, মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১০ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত:
২, ৩ ,৪,৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৪ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত; ৪টি এখনো প্রমাণিত হয়নি।
১. ৮ নভেম্বর মীর কাসেম আলির নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীরা ওমর-উল ইসলাম চৌধুরীকে আপহরণ ও নির্যাতন করে।
২. ১৯ নভেম্বর চাকতাই থেকে লুৎফর রগমান ও সিরাজকে অপহরণ ও নির্যাতন ২০ বছর কারাদণ্ড।
৩. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ডালিম হোটেলে নির্য়াতন ৭ বছর।
৪. সাইফুদ্দিন খানকে অপহরণ ও নির্যাতন।
৫. আব্দুল জব্বার মেম্বারকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতন
৬. হারুন-অর-রশিদকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতন।
৭. সানাউল্লাহ চৌধুরী, হাবিবুর রহমান ও ইলিয়াসকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতন।
৮. সামহানঘাটা মহল্লায় নুরুল কুদ্দস, মো. নাসিরসহ অপহরণ, আটক ও নির্যাতন।
৯. নাজিরবাড়ি এলাকা থেকে ৬ জনকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতন।
১০. ২৯ নভেম্বর নাজিরবাড়ি এলাকা থেকে সালাউদ্দিনসহ অনেককে অপহরণ।
১১. জসিম উদ্দিনসহ ৬ জনকে অপহরণের পর হত্যা ফাঁসি।
১২. লাঠু ও রাজুকে হত্যা, দোকানপাট লুট ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ (সংখ্যাগরিষ্ঠতায়)
১৩. দুলালকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতন।
১৪. নাসিরউদ্দিন চৌধুরীকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতন ১০ বছর।
মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনা ১১ নম্বর অভিযোগটি হচ্ছে- শহীদ জসীমউদ্দিনসহ ৬ জনকে অপহরণের পর নির্যাতন করে হত্যা ও লাশ গুম করা। ১২ নম্বর অভিযোগটি হচ্ছে- জাহাঙ্গীর আলমসহ তিনজনকে অপহরণের পর নির্যাতন, যাদের মধ্যে দুইজন মারা যায়।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত দুই সদস্যে বেঞ্চ এ রায় ঘোষনা করে।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন: বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।
কিশোর জসিম উদ্দিনকে হত্যার দায়ে তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে যেতে হলো মীর কাসেমকে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তুরীন আফরোজ বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে জাতি আজ দায়মুক্ত হলো।
সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে তাকে পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যানে করে পুরাতন হাইকোর্ট এলাকায় ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয়। এরপর কাসেমকে নিয়ে যাওয়া হয় ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়।
রায়ের জন্য তাকে গত শুক্রবারই গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়।
বিচার নিয়ে কিছু কথা:
গত ৪ মে বিচার শেষে মীর কাসেম আলীর মামলার সর্বশেষ ধাপ যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষ হওয়ায় মামলাটির রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
আদালতে মীর কাসেমের পক্ষে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার তানভীর আল আমিন। আর প্রসিকিউশনের পক্ষে সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার তুরীন আফরোজ।
উভয়পক্ষের সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।
মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলায় হত্যা, গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
গত বছরের ১৬ মে তার বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগের আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে। তার বিরুদ্ধে গঠন করা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। আর বাকি ১২টি অভিযোগ—অপহরণের পর আটকে রেখে নির্যাতন।
মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আট জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর যেকোনো দিন মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে চট্টগ্রাম শহরের অজ্ঞাত স্থান থেকে অপহরণ করে আলবদর সদস্যরা।
পরে মীর কাসেমের নির্দেশে জসিমকে ডালিম হোটেলে নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে নির্যাতন ও ২৮ নভেম্বর হত্যা করা হয়। পরে সেখানে নির্যাতনে নিহত আরও পাঁচ জনের সঙ্গে জসিমের লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
১২ নম্বর অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের নভেম্বরে মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা চট্টগ্রামের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হাজারী গলির বাসা থেকে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে তাদের হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। এ ছাড়া পাকিস্তানি সেনা ও সহযোগী রাজাকার-আলবদররা হাজারী গলির ২৫০ থেকে ৩০০ দোকান লুট ও অগ্নিসংযোগ করে।
মীর কাসেমের বিরুদ্ধে বাকি ১২টি অভিযোগে ২৪ জনকে অপহরণের পর আটক ও নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ অনুসারে, ৮ নভেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে অপহরণের পর তাদের ডালিম হোটেল, সালমা মঞ্জিল বা আছদগঞ্জের নির্যাতন কেন্দ্রে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। মীর কাসেমের নেতৃত্বে ও নির্দেশে তার নিয়ন্ত্রণাধীন আলবদর বাহিনী এসব অপহরণ ও নির্যাতন করে।
মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম বদল করে ছাত্রশিবির নামে রাজনীতি শুরু করে। মীর কাসেম ছিলেন ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ওই সময় থেকে তিনি জামাতের রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে দলটির অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার উদ্যোগ নেন।
১৯৮০ সালে তিনি রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী নামের একটি বিদেশি বেসরকারি সংস্থার এ দেশীয় পরিচালক হন। এ ছাড়া তিনি দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য।
২০১২ সালের ১৭ জুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মীর কাসেমকে গ্রেপ্তার করে। গত বছরের ১৬ মে রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ৫ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-১। পরে মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৪ জন ও আসামিপক্ষে তিন জন সাক্ষ্য দেন। ২৩ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়। গত ৪ মে দুই পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়।